ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

'জাতিসংঘকে সমঝোতামূলক বিশ্বের কেন্দ্রে দেখতে চায় বাংলাদেশ'

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২৫-০৯-২০২৬ ১১:৪১:১৬ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ২৫-০৯-২০২৬ ১২:৩১:০৯ অপরাহ্ন
'জাতিসংঘকে সমঝোতামূলক বিশ্বের কেন্দ্রে দেখতে চায় বাংলাদেশ' ​ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গ্লোবালাইজেশনের এ সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। তাই জাতিসংঘকে সমঝোতামূলক বিশ্বের কেন্দ্রে দেখতে চায় বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে জাতিসংঘ সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

তুমুল করতালির মধ্যে সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে নিজের প্রথম ভাষণ দিতে মঞ্চে ওঠেন তিনি। এতে বাংলাদেশের ‘গণতান্ত্রিক নবযাত্রার’ কথা তুলে ধরেন তিনি।

সাধারণ পরিষদের এ অধিবেশনে সভাপতিত্বের আসনে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি।

আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার তার সরকারের ভাবনার কথা তুলে ধরার আগে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সংকটময় বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার আহবান জানানোর পাশাপাশি ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ, তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায়, তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে এ বিশ্ব মঞ্চে তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট, সামরিক খাতে সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে, বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

তিনি বলেন, গ্লোবালাইজেশনের এ সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানব সৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে, বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যূত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট।

যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতা হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে তিনি দেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে, সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ, এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ-সবার জন্য বাংলাদেশ’।

বিশ্ব মানবতার প্রতিও বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, তারপর দীর্ঘ পাঁচ দশকের ত্যাগ-তিতিক্ষা-আন্দোলন এবং চব্বিশের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈষম্যমুক্ত, ন্যায় বিচারভিত্তিক কল্যাণকর রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাংখা বাস্তবায়নে নেয়া পরিকল্পনার কথা।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে, আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যে রাষ্ট্রে দলমত, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।

জাতিসংঘের এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে অতীতে বক্তব্য রেখেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সে স্মৃতি তুলে ধরার সময় কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন জাতিসংঘের মঞ্চে প্রথমবার বক্তৃতা দিতে আসা তারেক রহমান।

তার প্রয়াত বাবা-মায়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের এ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে, এ মুহূর্তে, আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই, আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে, আজ আমিও, আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে, এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।

অতীতের রেওয়াজ বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষণ দেন বাংলায়। বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং বিনিয়োগ পরিবেশ, সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব, একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে চলছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে, আমরা অংশীদারিত্ব উদ্ভাবন এবং দেশি বিদেশী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই ।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পথ ধরে তাদের বড় ছেলে তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

আগের বছর ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন।

সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগ করা এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে, জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়াতাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম-খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে, বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে। ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার পুনরুদ্ধার, সংস্কার, পুনর্গঠনের অর্থাৎ থ্রি আর কৌশল অনুসরণ করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এ কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থ বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।

দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীদের সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে। সে লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মত বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে, সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’-কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে, জনগণের কাছে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি'র ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে, বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি, এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে। সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে, উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে, এবং একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার উপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য, ব্যাগ এবং পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম, এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে, এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার এবং স্কুলে শিক্ষার মান বাড়বে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে, শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতো ‘স্পোর্টস’-কেও একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে, গত জুন মাসে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারাদেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে, ২ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলোজি, এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী, এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা, আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিজ্ঞানের এ অগ্রযাত্রায়, কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে, বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়… এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে, এ উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর, এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে, আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি। কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে, বিশ্ব সমাজকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা-সামগ্রী, ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও, বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবেলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। ক্লিন এনার্জি এবং সোলার এনার্জি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা-খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে।

বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে। একইসঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি, আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশন স্বাক্ষর করেছে।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল বলে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, পিসবিল্ডিং কমিশন এর ভাইস চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারীর অগ্রযাত্রা, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম, এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে।

অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীগণ তাদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ, উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিরাপদ, সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে। 

রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে, তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য, আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানাই।

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে, অদূর ভবিষ্যতে এটি এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেয়ার সময়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ